সেলিম মাহবুব : জামায়াতে নায়েবে আমীর আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ও এনসিপি নেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বরাবর বিতর্কের কেন্দ্রে।
নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বরাবরই উদ্ভট ও অবাস্তব বক্তব্য দিতে অভ্যস্ত—এ কথা নতুন কিছু নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠিক একই ধরনের চরিত্র ও বক্তব্যের প্রবণতা আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের মধ্যেও স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।
এই কারণেই আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর ‘শিষ্য’ বলা হলে আলাদা কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। তাদের বক্তব্য ও আচরণই রাজনৈতিক অবস্থান ও মানসিকতার প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে।
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের একটি বক্তব্য দেশবাসীর মনে গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
তার বক্তব্য শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়, এটি সরাসরি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছেন—চরমোনাইয়ের সঙ্গে জোট করায় তাকে নাকি আমেরিকান দূতাবাসে গিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে, এবং সেখানেই তিনি নিশ্চিন্তভাবে বলেছেন, “মৌলবাদ থাকলেও আমরা ওদের সেখান থেকে সরিয়ে আনছি।”
এই বক্তব্য শুধু ভয়ংকর নয়, এটি চরম লজ্জাজনকও। আরও ভয়াবহ হলো—তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন আমেরিকান এম্বাসি জামায়াতকে নির্দেশ দিচ্ছে কে মৌলবাদী, আর জামায়াত সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছে।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে বাস করছি, নাকি বিদেশি দূতাবাসের পরামর্শে পরিচালিত একটি রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে? একটি স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক দল, জোট, আদর্শ বা ধর্মীয় নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা হবে দেশের জনগণের সামনে—সংসদে, জনসভায়, গণমাধ্যমে। কিন্তু সেই আলোচনা যদি হয় বিদেশি দূতাবাসের ভেতরে গিয়ে, বিদেশি শক্তিকে সন্তুষ্ট করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে—তাহলে সেটা আর রাজনীতি থাকে না, সেটা নিছক দালালি হয়ে দাঁড়ায়।
আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সাহেবের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে—আপনাদের রাজনীতির মানদণ্ড জনগণের মতামত নয়, বরং বিদেশি শক্তির সন্তুষ্টি। আজ আপনারা চরমোনাইকে “এক্সট্রিমিজম থেকে সরানোর” কথা বলছেন, কাল কাকে সরাবেন? পরশু কাকে বাতিল করবেন? এই ‘সরানো’র ক্ষমতা আপনাদের কে দিয়েছে? বাংলাদেশের জনগণ, নাকি আমেরিকান এম্বাসি?
আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—চরমোনাই যদি সত্যিই মৌলবাদী হয়ে থাকে, তাহলে তাদের সঙ্গে প্রথমে জোট করলেন কেন? জোট করার আগে কি জামায়াত জানতো না তারা কারা? নাকি তখন মৌলবাদ সমস্যা ছিল না, সমস্যা হয়েছে যখন বিদেশি দূতাবাসে প্রশ্ন উঠেছে? তাহলে কি আদর্শ নির্ধারিত হয় দূতাবাসের প্রতিক্রিয়ার ওপর?
এটাই কি আপনাদের তথাকথিত আদর্শিক রাজনীতি? সুবিধা অনুযায়ী কেউ কখনো মৌলবাদী, আবার কখনো গ্রহণযোগ্য? আদর্শ কি এতই সস্তা যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিনিময়ে তা বিক্রি করা যায়?
জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস দেশের মানুষের অজানা নয়। কারা বারবার বিদেশি শক্তির কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করতে মরিয়া হয়েছে, আর কারা জনগণের শক্তির ওপর দাঁড়াতে ভয় পেয়েছে—দেশের মানুষ তা ভালো করেই জানে। আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সাহেবের বক্তব্য সেই ইতিহাসকেই নতুন করে নিশ্চিত করলো।
সবচেয়ে আপত্তিকর ও বিপজ্জনক দিক হলো—আপনি এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, যেন বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আমেরিকা, আর জামায়াত হবে সেই মধ্যস্থতাকারী। এটা শুধু রাজনৈতিক ঔদ্ধত্য নয়, এটি জাতীয় মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত।
বাংলাদেশ কোনো প্রটেক্টরেট রাষ্ট্র নয়। এটি কোনো পরীক্ষাগার নয়, যেখানে বিদেশিরা বসে ঠিক করবে কে এক্সট্রিম, কে মডারেট, কে গ্রহণযোগ্য আর কে বাতিল। বাংলাদেশের রাজনীতির ফয়সালা হবে এ দেশের জনগণের রায়ে—ওয়াশিংটন, লন্ডন কিংবা অন্য কোনো দূতাবাসের করিডোরে নয়।
আমজনতার দল স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করতে চায়—আমরা এমন রাজনীতি চাই না, যেখানে বিদেশিদের খুশি করতে গিয়ে দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে ট্যাগিং করা হয়। আমরা এমন রাজনীতি চাই না, যেখানে ক্ষমতার লোভে আদর্শ বিক্রি হয়। আমরা এমন রাজনীতি চাই না, যেখানে জনগণের পরিবর্তে দূতাবাসে জবাবদিহি করতে হয়।
চরমোনাই হোক, জামায়াত হোক কিংবা অন্য কোনো দল—কার আদর্শ কী, তা নির্ধারণ করবে দেশের জনগণ। কেউ কারও ‘সংস্কারক’ হয়ে বিদেশি প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়ন করবে—এই রাজনীতি আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি।
আজ যদি জামায়াত চরমোনাইকে “সরানোর” আশ্বাস দেয়, কাল তারা কাকে সরাবে—এই প্রশ্নের জবাব জামায়াতকেই দিতে হবে।
আর দেশের জনগণকে আমরা সতর্ক করে বলতে চাই—যারা বিদেশি দরবারে গিয়ে দেশের রাজনীতির হিসাব দেয়, তারা কখনোই জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি হতে পারে না। বাংলাদেশ কারও পরীক্ষার মাঠ নয়। এই দেশ আমজনতার। আর আমজনতার সিদ্ধান্তই শেষ কথা। আমজনতার সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফ বিল্লাহ বলেন এই কথাগুলো।