প্রকাশের সময়: ১৭ অক্টোবর, ২০২৫ ০৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ
চট্টগ্রাম ইপিজেডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: পানির সংকটে ফায়ার সার্ভিসের হিমশিম, ধসে পড়েছে ভবনের অংশ | MkProtidin
Logo
/ জাতীয়
অনির্দিষ্ট
আপডেটঃ ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৫:৩২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

চট্টগ্রাম ইপিজেডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: পানির সংকটে ফায়ার সার্ভিসের হিমশিম, ধসে পড়েছে ভবনের অংশ

চট্টগ্রাম ইপিজেডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: পানির সংকটে ফায়ার সার্ভিসের হিমশিম, ধসে পড়েছে ভবনের অংশ
ছবি : সংগৃহীত

শফিকুল ইসলাম শফিক : চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড)-এর ৫ নম্বর এলাকার নয়তলা ভবনে অবস্থিত অ্যাডামস ক্যাপ পোশাক কারখানায় বৃহস্পতিবার দুপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু হয় শ্রমিকদের মধ্যে। দমকল বাহিনীর ১৭টি ইউনিট টানা কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে, তবে পানির সংকট, ভবনের অনুপযুক্ত নকশা ও ফায়ার এক্সিটের অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। আগুনে তিনটি তলা ছাই হয়ে গেছে, ধসে পড়েছে ভবনের একাংশ।

দুপুর ২টার দিকে ভবনের মাঝামাঝি তলা থেকে প্রথম ধোঁয়া দেখা যায়। প্রথমে অনেকে সেটিকে মেশিনের ত্রুটি ভেবে গুরুত্ব না দিলেও মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

একজন শ্রমিক জানান, “ভেতরে ধোঁয়ায় কিছু দেখা যাচ্ছিল না। আমরা ছাদে উঠে চিৎকার করি, পরে বাইরে থেকে মই এনে নামানো হয়।”

আগুনের তীব্রতায় পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। প্রবেশপথে শত শত শ্রমিক, কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দা জড়ো হয়ে আতঙ্কে দাঁড়িয়ে থাকেন। অনেকে হাতের বোতল ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম বলেন,
“আমাদের ১৭টি ইউনিট কাজ করছে। কিন্তু আশপাশে বড় কোনো পানির উৎস না থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হচ্ছে। দাহ্য পদার্থ—কাপড়, রাসায়নিক ও প্যাকেজিং সামগ্রী—থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে।”

সূত্র জানায়, ইপিজেড এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব পানির উৎস নেই। পানি টানতে হয়েছে দূরের আগ্রাবাদ ও কালুরঘাট স্টেশন থেকে। এতে সময়ের ব্যবধানেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনের ওপরের তলাগুলোতে।

তদন্তে উঠে এসেছে—অ্যাডামস ক্যাপ ভবনের ফায়ার এক্সিট কার্যকর ছিল না, হাইড্রেন্ট সিস্টেম অকেজো। বৈদ্যুতিক তার ছিল উন্মুক্ত ও পুরোনো। একজন ফায়ার অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই ভবনে ন্যূনতম ফায়ার সেফটি স্ট্যান্ডার্ডও মানা হয়নি। ভবনের কাঠামোগত মানও প্রশ্নবিদ্ধ।”

চট্টগ্রাম ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক আবদুস সোবহান জানান,
“আগুনের উৎস ও ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।”

তবে শ্রমিক সংগঠনের দাবি—ফায়ার ড্রিল বা মহড়া নিয়মিত হয় না, সরঞ্জামও পুরোনো। এই অব্যবস্থা ও প্রশাসনিক শৈথিল্যই এ দুর্ঘটনার মূল কারণ।

প্রতিবার আগুনের পর তদন্ত হয়, কিন্তু বাস্তবে কিছুই বদলায় না।”
— রফিকুল ইসলাম, শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি বলেন  আগুনের তীব্রতায় বিকেল গড়াতেই ভবনের একটি অংশ ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের ভেতর দমকলকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে আটকা পড়া শ্রমিকদের খোঁজ চালান। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কেউ নিহত হয়নি, তবে কয়েকজন অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হন।

ইপিজেড থানার ওসি মোহাম্মদ জামির হোসেন বলেন, “পাশের তিনটি কারখানা খালি করা হয়েছে। আগুন ছড়িয়ে পড়লে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারত।”

অ্যাডামস ক্যাপ মূলত মেডিকেল ও প্রটেকটিভ পোশাক তৈরি করত। আগুনে কোটি টাকার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রস্তুত পণ্য পুড়ে গেছে।
প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা হতে পারে বলে ফায়ার সার্ভিসের ধারণা।

কারখানার কর্মকর্তারা বলেন, “তিনটি তলা সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সংযোগের শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।”

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক বলেন,“ইপিজেড এলাকায় ভবনের কাঠামোগত মান ও অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন আছে। এমন ভয়াবহ ঘটনা ছিল সময়ের অপেক্ষা মাত্র।”

তিনি আরও বলেন, “প্রতিটি শিল্পভবনে ন্যূনতম ফায়ার রেসপন্স টিম থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা কাগজে সীমাবদ্ধ।”

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে ইপিজেড ও এর আশপাশে অন্তত ১১টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে—তিনটিতে প্রাণহানি হয়েছে তবুও অগ্নিনিরাপত্তা তদারকি নিয়মিত হয়নি। সর্বশেষ পরিদর্শন হয়েছিল দেড় বছর আগে।

এক জ্যেষ্ঠ ফায়ার কর্মকর্তা বলেন,“আমাদের জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি থাকলেও, বড় সমস্যা হচ্ছে ভবন মালিকদের অনীহা। তারা নিরাপত্তা ব্যয়ের কথা চিন্তাই করেন না।”

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর এক কর্মকর্তা জানান,
“ইপিজেডের কারখানাগুলো বিদেশি ক্রেতার জন্য কাজ করে, অথচ নিরাপত্তা তদারকি আন্তর্জাতিক মানে হয় না। সরকারকে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।”

রাত সাড়ে ৮টার দিকে আগুন আংশিক নিয়ন্ত্রণে আসে। ধোঁয়া উঠতে থাকে ভবনের ওপরের তলাগুলো থেকে।
একজন মহিলা শ্রমিক বলেন,

“আমরা বেঁচে গেছি, কিন্তু ভয় রয়ে গেছে। কাল আবার কাজ শুরু হবে কিনা জানি না।”

এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়—এটি বাংলাদেশের
শিল্পাঞ্চলগুলোর অরক্ষিত বাস্তবতার নগ্ন প্রতিফলন। যেখানে শ্রমিকের নিরাপত্তা, ভবনের কাঠামোগত মান, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম, এমনকি পানির উৎস পর্যন্ত প্রশাসনিক অব্যবস্থার শিকার।

চট্টগ্রাম ইপিজেড দেশের সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি, অথচ সেখানেও যদি এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তবে সাধারণ শিল্পাঞ্চলের অবস্থা কতটা নাজুক—তা অনুমান করা কঠিন নয়।

গার্মেন্টস খাত অর্থনীতির প্রাণশক্তি, কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়ে গেছে কাগজে সীমাবদ্ধ। এই আগুন যেন কেবল এক দুর্ঘটনার গল্প না হয়ে উঠে—বরং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও সংস্কারের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়, সেটিই এখন সময়ের দাবি।

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ কবির নেওয়াজ রাজ | ভারপ্রাপ্ত প্রধান (অনলাইন) : মোঃ কবির নেওয়াজ রাজ
অফিস : বাসা-৬, রোড-৫, আটি সোসাইটি, আটি, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা-১৩১২
ইমেইল: mkprotidin@gmail.com | ফোন : (+880) 1643-565087 , (+880) 1922-619387