। পর্ব-০১ ।
মনুর মা আবারও এসে সাধাসাধি করে গেলো। কিন্তু করম আলীর কোনো সাড়াশব্দ নেই। তার যে খিদে নেই, তা নয়। খিদেটা তার অহঙ্কারী ভাঁড়ে মা ভবানীর মতো। খিদে আছে কিন্তু খাওয়ার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই।
করম আলী বসে আছে উঠোনের উত্তর পাশে, জামগাছটার গোড়ায়। পিঠ তার সাপটে আছে গাছটার অমসৃণ ত্বকে। থুতনি খুঁজে পাচ্ছে লোমের সান্নিধ্য, বুকের কাছাকাছি। হাত দুটো কোলে। একটা পা উরু সমেত মাটির সমান্তরালে নির্জীব সটান হয়ে আছে। আরেকটা পা গুটানো। চোখ এতক্ষণ বোজা ছিলো। এখন দৃষ্টি নিবদ্ধ মাটির দিকে।
সূর্য পশ্চিমের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে বেশ আগেই, কিন্তু এখনও উনুনে হাঁড়ি চড়েনি। অথচ কারও রান্নার চিন্তা নেই বা রাঁধুনির উচ্চবাচ্য নেই। খিদের যন্ত্রণা আছে, কিন্তু খাওয়ার আবদার নেই। এমনকি বুড়িটারও হাউকাউ নেই। অবশ্য করম আলীর পোলাদুটো কতক্ষণ আগে পর্যন্ত পেটের মোঁচড়ে ট্যা ট্যা করছিলো। মনুর মা পোলা দুটোকে নিয়ে খাইয়ে দিয়েছে।
কতক্ষণ আগেও করম আলীর বুড়ি মা'টা ঘরের দাওয়ায় নির্জীব হয়ে বসেছিলো। এখন গিয়ে বসেছে হেঁসেলের পাশে পাথর শক্ত ধবধবে মাটিটায়। বুড়ি বসেছে হাত-পা ছেড়ে, ঘাড় কুঁজো করে। নীল কাপড়ের ভেজাল সীমানা হাঁটু পর্যন্ত এসে স্থির হয়েছে। নীল আঁচলটা পুরোপুরি খসে পড়ে দলা হয়ে স্থান নিয়েছে বুকের নিচে, পানসি নৌকার আকার দেওয়া কোলে। বুড়ির মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকে থাকাতে তার শুকনো-চিটা বুকদুটো দেখা যাচ্ছে ঝুলে থাকা বাবুই পাখির বাসার মতো। মন্দ বাতাসে দুলছে, শুধু দুলছে।
বুড়ি এখন পুরো চুপ। এমন চুপচাপ এই জীবনে সে দ্বিতীয়বার হয়েছিলো কি না সন্দেহ। সারাক্ষণ এটা সেটা নিয়ে ঝগড়া-ফ্যাসাদ তার চাই-ই। একটা তুচ্ছ ব্যাপারকে বড় করে তোলার যথেষ্ট ক্ষমতা সে রাখে। বয়সের ভারে কুঁজো হলেও পায়ের জোর বেগানা মানত গাইয়ের মতো। সারাদিন এ-বাড়ি ও-বাড়ি করে বেড়ায়। এ ঘাট থেকে ও ঘাটে যায়। এপাড়ার মুখ ওপাড়া গিয়ে পড়ে। পাড়ার এমন কোনো মানুষ নেই যে তার গালিগালাজে অতিষ্ঠ হয়নি। করম আলী তার সেজো ছেলে। অন্য তিন ছেলের চেয়ে করম আলী অনেকটা হাবাগোবা, বোকাসোকা ধরনের। এই সুবিধেটুকু গ্রহণ করার জন্যই বুড়িটা এখানে পড়ে আছে। যখন তখন এটা সেটা নিয়ে খবরদারী করতে পারে। কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারে নির্দেশের প্রতিটি ভাষায়। আজো তাই করতে গিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেললো, ঘটিয়ে ফেললো একটা দুর্ঘটনা। কিন্তু এত বড় দুর্ঘটনা ঘটে যাবে বুড়ি তা আশা করেনি। তাই বুড়ি এখন বরফ-শীতল হতবাক।
করম আলীর আবার ঝিমুনি ভাব এলো। কিন্তু সে ঝিমালো না। তার অবাধ্য মন আনত দৃষ্টিকে ঠেলে দিলো সমান্তরালে। তার সামনে এক উঠোন বায়ু। পড়ন্ত দুপুরের রোদের ঝলক। তার দৃষ্টি রোদে জ্বলজ্বলা, উঠোন ভরা বায়ুকে তীরগতিতে ভেদ করে মৃদু ঝনঝন আওয়াজে বিদ্ধ করলো দক্ষিণ ঘরটার উত্তর দুয়ারে। ওখানে তার দেহ আছে। পাশাপাশি মনটা আছে কিনা সে ভেবে দেখেনি। এখন ভাবছে বিধ্বস্ত ভুবনের অন্য দেহটাকে নিয়ে। ভাবছে বিপথ স্রোতের ফেনিল মনটাকে নিয়ে। ভাবছে এই দু'টার মালকিন মমিনাকে নিয়ে। কিন্তু এই বিপন্ন স্রোত তো সে ইচ্ছে করে তৈরি করেনি। মনের উগ্রতাই কি তার মন?
করম আলী ভাবছে অন্য কিছু। তার ভাবনার অপ্রচলিত ভাষাগুলো আষ্টেপৃষ্ঠে মিলে একটা স্পষ্ট রেখার সৃষ্টি করছে। কিন্তু এই রেখা তো বড্ড বক্র আর অবিশুদ্ধ। এই অবিশুদ্ধ বক্ররেখার টাল-মাটাল বাসস্থানে কতটুকু থাই সে পাবে? হয়তো দেহ পাবে, নতুন আনকোরা, কিংবা একবার দু'বার অথবা বহুবার দলিতা। হয়তো মন পাবে বা পাবে না কিংবা খুঁজবে না, হারিয়ে যাবে-বিলীন হবে দেহের ভাঁজে। পাশাপাশি অবস্থান, চলে যাবে সময় ভাটার টানে। কিন্তু তার পোলাদু’টো কী পাবে? তার নতুন কেনা দেহে কি খুঁজে পাবে মমতার স্বাদ? তার ইচ্ছে হচ্ছে, ইচ্ছেটা সে লালন করার চেষ্টা করছে। আবার লজ্জা বোধটা স্পষ্টাস্পষ্ট মাথা চাড়া দিচ্ছে, ফিরিয়ে দিচ্ছে মনকে বার বার।
করম আলী কাঁদছে। কান্নাটা ঢেকুর তুলে তুলে বাড়িয়ে দিচ্ছে শব্দের আর্তনাদ। পরিস্থিতিটা পলে পলে তার বোকা-সরল বোধটাকে আরও বোকা বানিয়ে মায়াবী শিশুবোধের আকার দিচ্ছে। করম আলীর কান্নার সুর যাচ্ছে দক্ষিণ ঘরটার উত্তর দুয়ারে, যেখানে ধস নামা দেহটা পড়ে আছে। যেখানে তার মমিনা পড়ে আছে। মমিনা পড়ে আছে ফকফকা শুকনো মেঝের উপর। দেহটা তার কাত হয়ে আছে। হাতদুটো উরুর ভেতর ঢুকে, আর পা দু’টো বেঁকে এসে হাঁটুর দৃষ্টি মুখের দিকে নিবদ্ধ। কিন্তু তার চোখ দু’টো বোজা। মমিনা ঘুমায়নি। তার কান এতক্ষণ নির্বোধ ছিলো। কিন্তু হঠাৎ কান্নার আওয়াজে তার কান সক্রিয় হয়ে উঠলো। বস্তু বনে দেহটা হয়ে উঠলো সতেজ।
মমিনা উঠে বসলো। মানুষটার কান্নার সুর তার মনকে অবাধ্য করে তুললো। চিন্তা ঘুরপাক খেলো, কিন্তু কান্না এলো না অনেক চেষ্টায়ও। হঠাৎ এই ছন্দোপতন কেন?
মমিনার খুব কাঁদতে ইচ্ছে হলো। কান্নাকাটির পর বিশ্বাস আনাতে পারতো, তার দীর্ঘ নয় বছরের চেনা এতসব অচেনা হয়ে যাবে, চেনা গন্ধটা বিলীন হবে জিহ্বার তিনবার উঠানামার দৌরাত্মে। জিহ্বার এই তিনবার উঠানামার মাঝে কি মানুষের জীবনটা বাঁধা?
করম আলীর কান্নার সুর আরও চড়া হলো। মমিনা কান পেতে রইলো নিঃশব্দে, একান্ত চিত্তে। সে আবার শুইলো হাত-পা ছেড়ে, চিৎ হয়ে। ব্লাউজবিহীন অরক্ষিত বুকদ্বয় দেহের দু'পাশে ঝুলে পড়লো অশ্বপৃষ্ঠে ঝুলানো চালের বস্তার ন্যায়। তার বুকদু’টো, দেহ, দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নয় বছরের সাক্ষী। এমনকি নাকে পেতলের নাকফুলটাও এখনও জ্বলজ্বল করছে নয় বছরের সাক্ষী হয়ে। নাকের কোঠায় শ্লেষ্মার দাগ, কিন্তু চোখের কোঠায় অশ্রুর চিহ্ন নেই।
মমিনা এভাবে কিছুক্ষণ শুয়ে রইলো নিথর হয়ে। তারপর আবার উঠে বসলো। বড্ড ক্লান্তি বোধ হচ্ছে তার। সকালের সেই অঘটনের পর থেকে এখন পর্যন্ত কিছুই সে মুখে দেয়নি। অথচ ঘরে যে কিছু নেই, তা নয়। শিকেয় চিড়ে-মুড়ি আছে। মানুষটা পাটালি গুড় এনে রেখেছিলো সকালবেলা কাজের আগে খেয়ে যাওয়ার জন্য।
মমিনা তার দেহটাকে টেনে তুললো উপরের দিকে। ক্লান্ত দেহটা মাথাটাকে শূন্য করে দিলো। দু-দু'বার পাক খেয়ে টাল সামলে নিলো। মমিনা খাড়া হয়ে দাঁড়ালো। ভারবাহী জত্তর ন্যায় দেহটাকে টেনে টেনে নিয়ে গেলো দরোজার দিকে। কিন্তু দরোজার মুখোমুখী দাঁড়াতে তার বিবেকে বাঁধলো। একে তো পাপ হবে, তারপর লজ্জাও লাগছে। ঘৃণা যে আসছে না, তা নয়। কিন্তু মন তো আর প্রবোধ মানছে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কী এক আকর্ষণ তাকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে কান্নার উৎসস্থল, নিষিদ্ধ মানুষটার দিকে। তবুও মমিনা দাঁড়িয়ে গেলো। দাঁড়িয়ে রইলো মুহূর্তের হিসেবে। কিন্তু দেহটা তার চলে গেলো বেড়ার দিকে, আলোর ছিচকে গমনপথের দিকে। বেড়ার ফাঁকে সে উকি মারলো দক্ষিণ থেকে উত্তরে, কোনাকুনি নয়, সরল রেখা বরাবর। তার দৃষ্টি পড়লো এক উঠোন দূরে, জাম গাছটার গোড়ায়। তার দৃষ্টি স্থির হলো স্থবির হয়ে বসে থাকা মানুষটার ওপর। হঠাৎ ঘৃণাটা কেন জানি উবে গেলো তার নিজেরই অজান্তে। প্রচণ্ড বেদনাবোধ এসে জড়ো হলো তার মনে, চোখের নিস্তব্ধতায় ও কপালের ভাঁজে। মমিনা বুঝতে পারলো, দুর্ঘটনা যা ঘটার ঘটেছেই। মানুষটার দ্বারা বিন্দুমাত্র সৃষ্টি হয়নি। আর এটা বুঝতে পেরেই তার এতক্ষণে অশ্রুর মেঘ জমলো।