খ্যানখেনে গলার একঘেয়ে চিৎকার ! বেশিরভাগ বন্দিই তার প্রশ্নে গা করে না- পাশ কাটিয়ে চলে যায়! কেউ দাঁত খিচিয়ে গাল পাড়ে- ধূততুরি - ডিম খাউক্যা বুড়ি মা*গী !
তবুও কয়েদী ফজু খালা নিরলস বকবকায় !
বাইশ বছর ধরে জেল খাটে ফজু খালা। গত ছয় বছর ধরে মাথায় গোলমাল দেখা দিয়েছে! ঠিকমতো খায়না, সারাক্ষণ খক খক করে কাশে আর খসখস করে গা চুলকায়! এমনিতেই বেশিদিন ধরে যারা জেল খাটেন তাদের শরীরে প্রোটিনের দীর্ঘমেয়াদী অভাব হয়। তারপরও সে ডাল সব্জী খেতো না বলে উনার দড়ির মতো প্যাকাটি শরীরে এক বিন্দু রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা ছিলোনা!
তবে,বেচারী খুব হাউস করে ডিম খেতে চাইতো - জেলখানায় অবশ্য শুধু ঈদের দিন ছাড়া ডিম খাবার কোন সুযোগ নেই ! রোযার সময় যারা রোযা রাখে তারা একটি করে ডিম বরাদ্দ পায় ! মাথার তার ছেঁড়া বলে ফজু খালা রোযাও রাখতে পারতেন না!
তবে, সুযোগ পেলে আশপাশের বন্দিদের ডিম চুরি করে খেতেন! ধরা পরলে বেদম মাইর ! রোযদার বন্দিনীরা সকল সংযম ভুলে এই শীর্ণ দেহী মানসিক ভারসাম্যহীন কয়েদীর উপর চড়াও হতেন ! ক্যালসিয়ামের অভাবে বাঁকা হয়ে যাওয়া পিঠে দুমাদুম কিল ঘুষি! ধর্মশিক্ষা শুধু তাদের অনুশাসন পালনের উপর প্রভাব ফেলে, মানসিকতার উপরে তিলমাত্র নয়!
তাছাড়া দুর্বলের উপর আঘাত করতে জব্বর মজা- প্রতিঘাতের সম্ভাবনা যেহেতু শূন্য!
জেলখানায় বয়সের কোন লেহাজ নেই, যোগ্যতার কোন কদর নেই , অসুস্থের প্রতি কোন মমতা নেই- এখানে কেবল একটা জিনিসের কদর আছে - টাকা!
ফজু খালাকে টাকা দেবার কেউ নেই! নিজের একমাত্র ছেলেকে হত্যার দায়ে সতীন আর স্বামী তার নামে মামলা করেছে! ত্রিশ বছরের সাজা হয়েছে! জামিন করানোর মতো কেউ নেই তিন কূলে! দরিদ্র বন্দিনীরা ধনীদের কাজকর্ম করে দিয়ে কিছু উপার্জন করে! ফজু খালার হাড় জিরজিরে শরীর আর সারা গায়ে খোসপাঁচড়া দেখে কেউ তাকে দিয়ে কোন কাজও করায়না!
তবে, তার ডিম খাওয়ার খায়েস অলৌকিকভাবে পূরণ হলো! তাজউদ্দিন মেডিকেলে পরীক্ষা করে প্রমানিত হলো- ফজু খালা যক্ষ্মা রোগে ভুগছেন।
দুবেলা ডিম- মেডিকেল থেকে বরাদ্দ হলো ! কিন্তু সংক্রমন রোধ করতে তাকে সবার কাছ থেকে আলাদা করে একটি ছোট্ট সেলে রাখা হলো! চব্বিশ ঘন্টা লক আপ ! সেখানে দিনের বেলা মরা আলো ঢোকে বটে- কিন্তু সূর্য চোখে পরেনা -
তার মানসিক অবস্থার আরও অবনতি হলো - ভোরের ফাইলে গুনতির আগে থেকেই বিলাপ শুরু,
“বেইল উঠসে নি? কুসুমের লাহান সূর্য দেখতি মুন চায় ! আমারে কেউ বাইর কর! “
ঐ কুঠুরিতেই সে একদিন অনড় পড়ে ছিলো ফজু খালা! তোবড়ানো গাল বেয়ে চোখের পানি শুকিয়ে আছে, ঘোলাটে চোখের মনিতে আকুতি, ঠোঁটের পাশে ডিমের সাদা অংশ , কংকালসার একটা হাত চৌদ্দ শিকের বাইরে - হাতের তালুতে ডিমের কুসুম !
তাজউদ্দিনে নেয়ার পর চিকিৎসক বললেন, বেঁচে নেই !
আজও ভোরের সূর্য দেখলে ফয়জুননেসা খালার ডিমের কুসুম মনে পড়ে! কী যে কষ্ট!
এত কষ্ট কেন পৃথিবীতে ?
লেখকঃ ডাক্তার সাবরিনা মিষ্টি।